Meta Trader: দুর্বল মার্কিন ডলারের প্রভাব সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ঘিরে উদ্বেগের কারণে বৃহস্পতিবার এশিয়ার অধিকাংশ মুদ্রা সীমিত পরিসরে লেনদেন হয়েছে। আঞ্চলিক ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদে নতুন করে বিনিয়োগে অনীহা দেখিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে, যখন যুক্তরাষ্ট্র টানা পঞ্চম দিনের মতো ইরানের সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়। একই সঙ্গে তেহরান জানায়, হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ তাদের জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে নতুন করে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা বেড়েছে।
অন্যদিকে, প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল মার্কিন ভোক্তা ও উৎপাদক মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশের পর ডলারের ওপর চাপ অব্যাহত থাকে। এতে বাজারে ধারণা আরও জোরালো হয়েছে যে, চলতি মাসে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার অপরিবর্তিত রাখতে পারে। ইউএস ডলার ইনডেক্স (DXY) প্রায় ১০০.৫ পয়েন্টের কাছাকাছি স্থিতিশীল ছিল, যা গত এক মাসের সর্বনিম্ন স্তরের কাছাকাছি অবস্থান করছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সুদ বৃদ্ধি, তবুও চাপে ওন
মার্কিন ডলারের বিপরীতে দক্ষিণ কোরিয়ান ওন (USD/KRW) প্রায় ১,৪৮৫ ওনের কাছাকাছি স্থির ছিল। এদিন ব্যাংক অব কোরিয়া সাড়ে তিন বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো নীতিগত সুদের হার ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ২.৭৫ শতাংশে উন্নীত করে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে থাকলে ভবিষ্যতেও সুদের হার আরও বাড়ানো হতে পারে।
তবে বহুল প্রত্যাশিত এই সিদ্ধান্ত ওনকে উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী করতে পারেনি। কারণ, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তি খাতের শেয়ারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ধারাবাহিক বিক্রি এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাজারে চাপ সৃষ্টি করছে। যদিও সেমিকন্ডাক্টরনির্ভর দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে শেয়ারবাজার থেকে মূলধন প্রত্যাহারের কারণে মুদ্রাটি চাপের মুখে রয়েছে।
হস্তক্ষেপের জল্পনায় আলোচনায় জাপানের ইয়েন
জাপানি ইয়েনও বিনিয়োগকারীদের বিশেষ নজরে রয়েছে। USD/JPY বিনিময় হার সামান্য কমে ১৬২.১ ইয়েনে নেমে আসে।
জাপানের অর্থমন্ত্রী সাতসুকি কাতায়ামা সম্প্রতি সরকারি পেনশন বিনিয়োগ তহবিলের (GPIF) সম্পদ বণ্টন পুনর্বিবেচনার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করায় বাজারে সরকারি হস্তক্ষেপের জল্পনা বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বহু দশকের সর্বনিম্ন অবস্থানে থাকা ইয়েন নিয়ে জাপান সরকার ক্রমেই অস্বস্তিতে পড়ছে।
অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মুদ্রায়ও চাপ
এদিকে, USD/AUD সামান্য বেড়েছে, ফলে অস্ট্রেলিয়ান ডলার কিছুটা দুর্বল হয়েছে। একইভাবে USD/NZD-ও অল্প বৃদ্ধি পেয়েছে। সপ্তাহের শুরুতে ২৫ বেসিস পয়েন্ট সুদ বৃদ্ধির পর শক্তিশালী হওয়া নিউজিল্যান্ড ডলারও কিছুটা লাভ হারিয়েছে।
দুর্বল ডলারের মধ্যেও স্থিতিশীল চীনের ইউয়ান
ডলার দুর্বল হলেও চীনের ইউয়ান তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল। কারণ, মিশ্র অর্থনৈতিক তথ্য এবং পিপলস ব্যাংক অব চায়না (PBOC)-এর সাম্প্রতিক মন্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, নীতিনির্ধারকরা ইউয়ানের দ্রুত মূল্যবৃদ্ধির পরিবর্তে স্থিতিশীল বিনিময় হার বজায় রাখতে আগ্রহী।
USD/CNY প্রায় ৬.৭৭ ইউয়ান এবং অফশোর USD/CNH-ও প্রায় অপরিবর্তিত ছিল। যদিও পিবিওসি এপ্রিলের পর সর্বোচ্চ শক্তিশালী দৈনিক মধ্যবর্তী বিনিময় হার নির্ধারণ করেছে, তবুও বাজারে এর প্রভাব ছিল সীমিত।
চীনের প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার চেয়ে কম
দ্বিতীয় প্রান্তিকে চীনের অর্থনীতি বছরওয়ারি ৪.৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, যা বাজারের প্রত্যাশার নিচে এবং গত তিন বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে ধীরগতির প্রবৃদ্ধি।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং এশিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে চীনের এই ধীরগতি অঞ্চলজুড়ে রপ্তানি চাহিদা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। ফলে বেইজিং থেকে আরও প্রণোদনামূলক নীতির প্রত্যাশা বাড়লেও তা তাৎক্ষণিকভাবে ইউয়ানকে শক্তিশালী করতে পারেনি।
বুধবার পিবিওসির উপ-গভর্নর ঝৌ লান বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও নমনীয় ও বাজারনির্ভর ইউয়ান বিনিময় হারকে সমর্থন করে এবং বাজারের শক্তিকে আরও বড় ভূমিকা দেওয়া হবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে ইউয়ানের মূল্য কৃত্রিমভাবে বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা নেই বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।
এখন নজর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক তথ্য ও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিতে
বাজারের পরবর্তী প্রধান নজর থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের খুচরা বিক্রয় (Retail Sales) এবং সাপ্তাহিক বেকারত্ব ভাতা দাবির (Jobless Claims) তথ্যের দিকে। সাম্প্রতিক দুর্বল মূল্যস্ফীতির তথ্যের পর জুলাইয়ে ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির যেকোনো নতুন অগ্রগতি বৈশ্বিক মুদ্রাবাজার ও আর্থিক বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।