Meta Trader- যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট লাঘব এবং সরকার পরিবর্তন নিয়ে জনমনে তৈরি হওয়া অসন্তোষ প্রশমনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার অংশ হিসেবে বিদ্যুৎ বিলে কর ছাড়ের ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম।
দায়িত্ব গ্রহণের দ্বিতীয় দিনে মঙ্গলবার বার্নহ্যাম জানান, তাঁর সরকার আগামী ১ অক্টোবর থেকে বাসা-বাড়ির বিদ্যুৎ বিলের ওপর থেকে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) প্রত্যাহার করবে। এর ফলে পরিবারপ্রতি বছরে গড়ে প্রায় ১,৮৬২ পাউন্ড খরচ হওয়া বিল থেকে প্রায় ৪৫ পাউন্ড সাশ্রয় হবে।
রাজস্ব নীতির এই ছাড় কীভাবে অর্থায়ন করা হবে, তা নিয়ে বন্ড বাজারের বিনিয়োগকারীদের নজর ছিল তীক্ষ্ণ। বার্নহ্যাম জানিয়েছেন, গত রবিবার বাতিল হওয়া ১.৮ বিলিয়ন পাউন্ডের ($২.৪২ বিলিয়ন) ‘ডিজিটাল আইডি’ প্রকল্পের সাশ্রয়কৃত অর্থ দিয়েই এই কর ছাড়ের অর্থসংস্থান করা হবে।
এক বিবৃতিতে বার্নহ্যাম বলেন, “জ্বালানি বিলে কর কমিয়ে জনগণের পকেটে উদ্বৃত্ত অর্থ রাখা এবং তাদের মাঝে প্রত্যাশার সঞ্চার করতে আমরা তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিচ্ছি।” জনগণকে কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি এই ঘোষণা দেন।
দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার প্রয়াস
গ্রেটার ম্যানচেস্টারের ৫৬ বছর বয়সী সাবেক মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যাম সাধারণ মানুষকে দেওয়া অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কতটা আন্তরিক—তা দ্রুত প্রমাণের চেষ্টা করছেন।
তিনি সোমবারে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, তাঁর প্রাথমিক নীতিগুলো হয়তো নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির চাপে থাকা মানুষদের সম্পূর্ণ স্বস্তি দিতে পারবে না। তবে চলতি বছরের শেষের দিকে এ সংক্রান্ত একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা পেশ করা হবে।
তবে তাঁর এই এজেন্ডাকে ঘিরে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির ভেতরেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের ঘনিষ্ঠ মিত্র ড্যারেন জোন্স সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ (টুইটার) প্রশ্ন তুলেছেন—ডিজিটাল আইডি প্রকল্পের কোনো নির্দিষ্ট অর্থায়ন অনুমোদন ছিল না। ফলে জ্বালানি বিলে দেওয়া এই ছাড়ের আর্থিক সংস্থান নতুন প্রধানমন্ত্রীর কাছে সত্যিই আছে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। জোন্স লেখেন, “নতুন নীতিগুলোর অর্থায়ন কীভাবে হবে, তা সরকারকে আগামী বাজেটে স্পষ্ট করতে হবে।”
অন্যদিকে, অনেক জ্বালানি বিশেষজ্ঞ প্রশ্ন তুলেছেন এই পদক্ষেপের সার্বিক প্রভাব নিয়ে। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় আগামী অক্টোবরে সামগ্রিক জ্বালানি বিলের সর্বোচ্চ সীমা (প্রাইস ক্যাপ) এমনিতেই বাড়তে পারে। ফলে এই ক্ষুদ্র কর ছাড় কতটুকু প্রভাব ফেলবে—তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের পর পাইকারি বাজারে গ্যাসের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পায়, যা যুক্তরাজ্যে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখে। এটিই মূলত যুক্তরাজ্যের জীবনযাত্রার ব্যয় সংকটের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তৎকালীন কনজারভেটিভ সরকার জ্বালানি মূল্যের নিশ্চয়তা দিতে শত শত কোটি পাউন্ড ব্যয় করেছিল। কিন্তু ২০২৩ সালের মাঝামাঝি থেকে বিশ্ববাজারে দাম কিছুটা কমলেও বর্তমানে তা সংকট-পূর্ব সময়ের চেয়ে প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি।
বার্নহ্যামের উদ্যোগকে ইতিবাচক মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে ‘এন্ড ফুয়েল পোভার্টি কোয়ালিশন’। তবে সংস্থাটি যোগ করে, “সাধারণ পরিবারগুলো এখন যে বিপুল আর্থিক সংকটের মোকাবিলা করছে, এটি তার সাপেক্ষে যথেষ্ট নয়।”
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘রেজোলিউশন ফাউন্ডেশন’-এর প্রধান নির্বাহী রুথ কার্টিস বলেন, ছাড়টি সুনির্দিষ্টভাবে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য নির্ধারণ না করায় তুলনামূলকভাবে উচ্চ আয়ের পরিবারগুলোও সুবিধা পাবে। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “চলতি অক্টোবরেই যেখানে বিল ১৫০০ পাউন্ডের বেশি বাড়ার শঙ্কা রয়েছে, সেখানে এই অর্থ সুনির্দিষ্টভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় ব্যয় করা হলে আরও ভালো ফল পাওয়া যেত।”
রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও অর্থনৈতিক চাপ
নিম্ন আয়ের মানুষদের দ্রুত স্বস্তি দিতে বার্নহ্যাম তাঁর মেয়াদের শুরুতেই বেশ কিছু বড় নীতি ঘোষণার কথা নিশ্চিত করেছেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “জনগণ যেন খুব দ্রুত এই পরিবর্তনের প্রভাব বাস্তবে অনুভব করতে পারেন, আমি সেটাই নিশ্চিত করতে চাই।”
জনপ্রিয়তাবাদী দল ‘রিফর্ম ইউকে’ এবং এর নেতা নাইজেল ফারাজের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে লেবার পার্টির সমর্থন ফেরানোই তাঁর প্রধান লক্ষ্য।
উত্তর ইংল্যান্ডে ম্যানচেস্টারের স্বার্থ রক্ষায় জোরালো ভূমিকার জন্য বার্নহ্যামকে “কিং অব দ্য নর্থ” বলা হয়ে থাকে। যুক্তরাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধানদের মধ্যে তিনি এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে জনপ্রিয় মুখ।
তবে গত এক দশকে যুক্তরাজ্যে একের পর এক প্রধানমন্ত্রীর বিদায়প্রক্রিয়া প্রমাণ করেছে যে, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে দলের শীর্ষ নেতাকে সরিয়ে দিতে রাজনৈতিক দলগুলো খুব বেশি সময় নেয় না।
বিষয়টি মাথায় রেখে দায়িত্ব নিয়েই জনকল্যাণে ঝাঁপিয়ে পড়তে চান বার্নহ্যাম। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর প্রথম ভাষণেই তিনি যুক্তরাজ্যে গৃহহীন মানুষের আবাসন সংকট দূর করার অঙ্গীকার করেন।
পরিবারগুলোর ওপর চাপ কমাতে তিনি বাস ভাড়ায় নির্দিষ্ট সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণসহ (যা তিনি আগে ম্যানচেস্টারে সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছিলেন) আরও কিছু পদক্ষেপ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে তাঁর দেওয়া সেই অঙ্গীকারেরই বাস্তবায়ন ঘটবে—”আমি সব কাজের কেন্দ্রবিন্দুতে মানুষের কল্যাণকে রাখব।”
তবে সোমবারে সরকার ঋণের সুদহার (বন্ড ইয়িল্ড) বৃদ্ধি পাওয়ার পর, বাজার এখন গভীর পর্যবেক্ষণে রাখছে যে বার্নহ্যাম ও তাঁর আকস্মিক নিযুক্ত অর্থমন্ত্রী (সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রী) জন হিলি কীভাবে এই নতুন খরচের সামঞ্জস্য বিধান করেন।