Meta Trader— যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সংঘাত এবং ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথিদের জাহাজ চলাচলে হুমকির ফলে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা জোরালো হয়ে উঠেছে। এর জেরে বুধবার জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে প্রায় ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ৯৫ ডলার অতিক্রম করেছে।
জিএমটি ১৩২৩ টা নাগাদ ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারসের দাম ২.২৩ ডলার বা ২.৪৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেল প্রতি ৯৩.২৪ ডলারে দাঁড়ায়। লেনদেনের এক পর্যায়ে এর সর্বোচ্চ দাম উঠেছিল ৯৫.৪৭ ডলার।
অন্যদিকে, মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ২.১৮ ডলার বা ২.১৮ শতাংশ বেড়ে ব্যারেল প্রতি ৮৬.১৮ ডলারে পৌঁছায়।
উভয় বেঞ্চমার্কই ১১ জুনের পর তাদের সর্বোচ্চ দর স্পর্শ করেছে।
এদিকে, ব্রেন্ট ক্রুডের তিন মাসের ‘টাইমসপ্রিড’ বেড়ে ব্যারেল প্রতি ১০.৮৯ ডলারে পৌঁছেছে, যা ২২ মে-র পর সর্বোচ্চ। সরবরাহ ঝুঁকি বাড়ায় বাজারে ‘ব্যাকওয়ার্ডেশন’ (সবচেয়ে নিকটবর্তী সময়ের তেলের দাম ভবিষ্যতের চুক্তির চেয়ে বেশি হওয়া) আরও গভীর হয়েছে। সাধারণত স্বল্পমেয়াদী সরবরাহ সংকটের সংকেত দেয় এই অবস্থা।
মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা টানা ১১তম রাতের মতো ইরানে বিমান হামলা চালিয়েছে। কুয়েতি সেনাবাহিনী তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে ইরানি ড্রোন ধ্বংস করার কথা জানানোর কিছুক্ষণ পরই এই হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, প্রণালী বা হরমুজ প্রণালীতে তেহরান কোনো জাহাজে হামলা চালালেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবার তাদের “একটি করে সেতু বা বিদ্যুৎ কেন্দ্র বোমাবর্ষণে ধ্বংস করে দেবে”।
এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে সংঘাত তৈরির পাশাপাশি, ইরান-ঘনিষ্ঠ হুথি বিদ্রোহীরা বাব এল-মান্দেব প্রণালীতে সৌদি তেলবাহী জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি দিয়ে এবং সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ-অবরোধ ঘোষণা করে যুদ্ধের নতুন এক ফ্রন্ট উন্মোচন করেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিশেষ নৌবাহিনী ‘অ্যাসপাইডস’ (Aspides) বুধবার এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ইসরায়েল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা সৌদি আরবের সাথে সম্পৃক্ত জাহাজগুলো ইয়েমেনের হুথি মিলিশিয়াদের হামলার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই তাদের লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগর পরিহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেন, “জ্বালানি বাজার এখন জোড়া-প্রণালী (হরমুজ ও বাব এল-মান্দেব) সংকটে পড়েছে। লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের সংখ্যা ট্রেডাররা সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং হরমুজ প্রণালীর পাশাপাশি বাব এল-মান্দেব প্রণালীও নতুন উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে।”
চলতি মাসের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যবর্তী যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যাওয়ার পর থেকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে যায়। ফলে লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে অবস্থিত বাব এল-মান্দেব প্রণালীটি সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ হয়ে ওঠে।
লোহিত সাগরে চীন ও ভারতের উদ্দেশ্যে সৌদি অপরিশোধিত তেল নিয়ে যাওয়া তিনটি তেল ট্যাঙ্কার মঙ্গলবার ইয়েমেন উপকূলের ঝুঁকিপূর্ণ পথ এড়িয়ে সুয়েজ খালের দিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়।
বুধবার লোহিত সাগরে আরও চারটি ট্যাঙ্কার একইভাবে গতিপথ পরিবর্তন করেছে।
ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম নাগা.কম (Naga.com)-এর বাজার বিশ্লেষক ফ্রাঙ্ক ওয়ালবাম বলেন, “হুথিদের হুমকির কারণে ট্যাঙ্কারগুলো তাদের পথ পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে, যা বাজারে তেলের বাস্তব সরবরাহ এবং সৌদির রপ্তানির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। পরিণতিতে তেলের দাম ওপরের দিকে উঠছে।”
হুথিদের এই হুমকির জবাবে, এশিয়ার তেল শোধনাকারীরা (রিফাইনারি) এখন সুয়েজ খাল এবং আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে সৌদি আরবের লোহিত সাগরীয় ইয়ানবু বন্দর থেকে অপরিশোধিত তেল পরিবহনের চেষ্টা চালাচ্ছে।