মেটাট্রেডার.বিডি: হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করার সময় একটি তেলবাহী ট্যাংকারে অজ্ঞাত ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর মঙ্গলবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) সংস্থা এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
ইউকেএমটিও জানিয়েছে, আক্রান্ত জাহাজটির কাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এতে কোনো হতাহত বা পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। ওই প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী অন্যান্য জাহাজগুলোকে “সতর্কতার সাথে ট্রানজিট” করার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
পূর্বাঞ্চলীয় সময় (ইটি) সকাল ১০:১২ মিনিট (জিএমটি ১৪:১২) পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২.৭% বেড়ে ব্যারেল প্রতি ৭৩.৯৩ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ২.৫% বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেল প্রতি ৭০.২৯ ডলারে পৌঁছেছে।
এর আগে ইউকেএমটিও জানায়, ওমান উপকূলের কাছাকাছি দক্ষিণ দিকে যাওয়ার সময় একটি ট্যাংকারে অজ্ঞাত ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে এবং এর ফলে সেখানে আগুন ধরে যায় বলে তারা প্রতিবেদন পেয়েছে। ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে এই হামলার দায় স্বীকার করেনি। তবে দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, কাতার থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস বহনকারী একটি ট্যাংকারকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’ দুজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, সোমবার রাতে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে ইরান অন্তত দুটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সমঝোতার অধীনে এক সপ্তাহ ধরে চলা হামলার বিরতি শেষ হলো। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা হামলা চালিয়ে এর জবাব দেবে।
এদিকে ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করতে চাওয়া যেকোনো জাহাজকে অবশ্যই তেহরানের অনুমোদিত রুট ব্যবহার করতে হবে। একই সাথে তারা যোগ করেছে যে, এতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ধরনের হস্তক্ষেপের “দ্রুত ও নিষ্পত্তিমূলক জবাব” দেওয়া হবে।
অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে প্রণালীতে হামলা স্থগিত রাখার এক সপ্তাহের চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরই এই হামলার ঘটনা ঘটল। এর ফলে তিন সপ্তাহেরও কম সময় আগে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) ভেস্তে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
গত জুনে অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে অপরিশোধিত তেলের দাম কিছুটা কমতির দিকে ছিল। এর আগে ফেব্রুয়ারি শেষের দিকে সংঘাত শুরু হওয়ার পর তেলের দাম একপর্যায়ে ব্যারেল প্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল, যা বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করে।
সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা গেছে যে, এই প্রণালী দিয়ে আবারও তেলের প্রবাহ শুরু হয়েছে, যদিও এটি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়েছে কি না তা এখনো স্পষ্ট নয়। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং লেবাননে ইসরায়েল ও তেহরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের মধ্যকার লড়াইয়ের পাশাপাশি হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ এখন শান্তি আলোচনার একটি প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৈশ্বিক শিপিংয়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই চোকপয়েন্ট বা কৌশলগত জলপথের ওপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার দাবি জানিয়েছে ইরান। তবে যুক্তরাষ্ট্র এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।
ডয়েচে ব্যাংকের হেনরি অ্যালেনসহ কয়েকজন বিশ্লেষক এক নোটে বলেছেন, “হরমুজ প্রণালী দিয়ে এখনো স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম জাহাজ চলাচল করলেও তেলের দাম সংঘাত-পূর্ববর্তী স্তরে ফিরে এসেছে। এখানে সরবরাহ চেইনে এখনো চাপ রয়েছে।”
তবে বাজারে তেলের বৈশ্বিক সরবরাহ বৃদ্ধির পূর্বাভাসের কারণে তেলের দামের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা কিছুটা লাগাম পেয়েছে। পেট্রোলিয়াম রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংস্থা ‘ওপেক’ (OPEC) এবং রাশিয়াসহ তার সহযোগীরা গত রবিবার এক বৈঠকে সম্মত হয়েছে যে, জুন ও জুলাই মাসের ধারাবাহিকতায় আগামী আগস্ট থেকেও তারা প্রতিদিন ১ লক্ষ ৮৮ হাজার ব্যারেল তেল উৎপাদন বাড়াবে।