চীনের রেয়ার আর্থ রপ্তানি নিয়ন্ত্রণে ঝুঁকিতে পশ্চিমা বিশ্বের ৬.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের শিল্পখাত: আইইএ
লন্ডন, ১৬ জুলাই (রয়টার্স): চীনের রেয়ার আর্থ (বিরল খনিজ) রপ্তানিতে আরোপিত বিধিনিষেধ পুরোপুরি কার্যকর হলে চীনের বাইরে প্রায় ৬.৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের শিল্প উৎপাদন সরবরাহ সংকটের ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA)।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত গ্লোবাল ক্রিটিক্যাল মিনারেলস আউটলুক প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানায়, রেয়ার আর্থ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে বিশ্বব্যাপী অটোমোবাইল, উচ্চপ্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা এবং জ্বালানি খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বিশ্বের বৃহত্তম রেয়ার আর্থ উৎপাদনকারী দেশ চীন গত বছরের অক্টোবরে অতিরিক্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ওপর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে এবং নতুন রপ্তানি লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালুর ঘোষণা দেয়। তবে পরবর্তীতে এসব বিধিনিষেধ কার্যকরের সময়সীমা এক বছরের জন্য স্থগিত করতে সম্মত হয়।
কেন গুরুত্বপূর্ণ রেয়ার আর্থ?
রেয়ার আর্থ হলো ১৭টি বিশেষ ধাতুর একটি গোষ্ঠী, যেগুলো অল্প পরিমাণে ব্যবহৃত হলেও আধুনিক শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গাড়ি, বিমান, স্মার্টফোন, কম্পিউটার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি থেকে শুরু করে উন্নত সামরিক অস্ত্র ব্যবস্থার উৎপাদনে এসব খনিজ অপরিহার্য।
আইইএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি কার্যকর হলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দিতে পারে, যার ফলে চীনের বাইরে ৬.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের উৎপাদন কার্যক্রম ঝুঁকির মুখে পড়বে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতির আশঙ্কা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ক্ষতির প্রায় অর্ধেকই বহন করতে হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপকে, কারণ উচ্চপ্রযুক্তি ও উন্নত উৎপাদন শিল্পে এই অঞ্চলগুলোর রেয়ার আর্থের ওপর নির্ভরশীলতা অত্যন্ত বেশি।
আইইএর নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরোল বলেন,
“আমাদের সর্বশেষ বিশ্লেষণ দেখায়, তুলনামূলকভাবে অল্প পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ওপর বিপুল অর্থনৈতিক মূল্য নির্ভর করছে। কিন্তু এসব খনিজের সরবরাহ শৃঙ্খল কয়েকটি দেশের মধ্যে অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত হওয়ায় তা সহজেই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।”
গ্রাফাইট নিয়েও সতর্কতা
রেয়ার আর্থের পাশাপাশি বৈদ্যুতিক গাড়ির (EV) ব্যাটারির অন্যতম প্রধান কাঁচামাল গ্রাফাইট রপ্তানিতে চীনের পরিকল্পিত নিয়ন্ত্রণ নিয়েও সতর্ক করেছে আইইএ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রাফাইট রপ্তানির বিধিনিষেধ সম্পূর্ণ কার্যকর হলে চীনের বাইরে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের শিল্প উৎপাদন সরবরাহ ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
বর্তমানে বিশ্বে প্রক্রিয়াজাত গ্রাফাইট উৎপাদনের ৯০ শতাংশেরও বেশি চীনের দখলে রয়েছে।
বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলছে পশ্চিমা বিশ্ব
চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপসহ পশ্চিমা দেশগুলো বিকল্প গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ জোরদার করেছে।
আইইএ জানিয়েছে, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে নতুন খনিজ প্রকল্পে সরকারি অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি চার গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও মালয়েশিয়ায় নতুন রেয়ার আর্থ পরিশোধন (Refining) প্রকল্প চালু হওয়ায় বৈশ্বিক বাজারে চীনের অংশীদারিত্ব ২০২৩ সালের ৯০ শতাংশ থেকে গত বছর ৮৫ শতাংশে নেমে এসেছে।
সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, পরিকল্পনাধীন প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়িত হলে ২০৩৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিক রেয়ার আর্থ পরিশোধন বাজারে চীনের অংশীদারিত্ব কমে প্রায় ৭০ শতাংশে নেমে আসতে পারে।