Meta Trader- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও রোবটিক্স খাতে ব্যয়ের পরিমাণ অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় দুই বছরেরও বেশি সময় পর চলতি প্রান্তিকে প্রথমবার নগদ অর্থ ঘাটতির (ক্যাশ বার্ন) মুখোমুখি হতে যাচ্ছে মার্কিন বৈদ্যুতিক গাড়ি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ‘টেসলা’। বুধবার প্রকাশিতব্য আর্থিক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর এর মধ্য দিয়েই মূলত এই মেগা প্রকল্পে দেওয়া বিনিয়োগের সুফল কবে আসবে, তা নিয়ে বিনোয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ আরও জোরালো হচ্ছে।
টেসলার প্রধান নির্বাহী ইলোন মাস্ক সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানের মূল দৃষ্টি ঐতিহ্যবাহী গাড়ি নির্মাণ থেকে সরিয়ে ‘ফিজিক্যাল এআই’ ব্যবসা যেমন—স্বয়ংক্রিয় চালকহীন ট্যাক্সি (রোবোট্যাক্সি) এবং হিউম্যানয়েড রোবট তৈরির দিকে ঘুরিয়ে নিয়েছেন। মূলত এই প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করেই বর্তমানে টেসলার বাজার মূল্যায়নের বড় একটি অংশ নির্ভর করছে।
তবে এআই পরিকাঠামো (ডাটা সেন্টারসহ) ও উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে চলতি বছরে প্রতিষ্ঠানটির মূলধনি ব্যয় ২৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এটি টেসলার মূল অটোমোবাইল ও জ্বালানি খাত থেকে অর্জিত ত্রৈমাসিক আয়ের চেয়েও অনেক বেশি। ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এ নিয়ে অস্বস্তি বাড়ছে।
আর্থিক সেবা সংস্থা ‘মরগান স্ট্যানলি’-র বিশ্লেষকরা এক পর্যালোচনা নোটে লিখেছেন, “মূলধনি ব্যয় দ্বিগুণ হওয়ার পাশাপাশি ‘ফ্রি ক্যাশ ফ্লো’ বা ব্যবহারের উপযোগী নগদ অর্থ ঋণাত্মক হয়ে পড়ায়, টেসলার এই ব্যয় কীভাবে ফিজিক্যাল এআই খাতে কোম্পানির অবস্থান আরও শক্ত করছে—সেটির সুনির্দিষ্ট প্রমাণের দিকেই এখন বিনিয়োগকারীদের মূল নজর।”
বিনিয়োগকারীরা এতদিন বাজি ধরছিলেন যে, টেসলার স্বয়ংক্রিয় ড্রাইভিং প্রযুক্তি এবং রোবটিক্স পরিকল্পনা ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানটিকে বিশাল মুনাফাজনক আয়ের নতুন পথ খুলে দেবে। তবে বিশ্লেষকদের প্রত্যাশার চেয়ে এই অগ্রগতি অত্যন্ত ধীরগতির। এছাড়া মাস্ক নিজেও তাঁর নির্ধারিত কয়েকটি সময়সীমা রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন।
গত বছরের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের অস্টিনে রোবোট্যাক্সি সেবা চালু করার পরপরই মাস্ক ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, ২০২৫ সালের শেষের মধ্যে টেসলার রোবোট্যাক্সি যুক্তরাষ্ট্রের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে যাবে। এরপর গত জানুয়ারিতে টেসলা জানায়, ২০২৬ সালের প্রথম অর্ধে এটি নতুন আরও সাতটি শহরে প্রসারিত হবে। কিন্তু বাস্তবে কোম্পানিটির রোবোট্যাক্সি নেটওয়ার্ক এখনও কেবল টেক্সাসের অস্টিন, ডালাস, হিউস্টন এবং ফ্লোরিডার মায়ামির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
বুধবার কোম্পানির প্রান্তিক আয়ের হিসাব প্রকাশের আগেই টেসলার বিনিয়োগকারী ড্যাশবোর্ডে একজন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর করা একটি প্রশ্ন সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছে। প্রশ্নটি ছিল: “টেসলাকে তাদের এই স্বল্পমেয়াদী লক্ষ্যগুলো অর্জনে আসলে কোন বিষয়টি বাধা দিচ্ছে?”
শীর্ষ ১০টি প্রশ্নসূচির ৯টিই ঘুরপাক খাচ্ছে টেসলার এআই-চালিত উদ্যোগ—রোবোট্যাক্সি, ‘অপটিমাস’ হিউম্যানয়েড রোবট এবং ‘ফুল সেলফ-ড্রাইভিং’ (এফএসডি) প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে।
অন্য এক বিনিয়োগকারী প্রশ্ন তুলেছেন, “রোবোট্যাক্সি বহরের প্রবৃদ্ধি থমকে গেল কেন? আমরা কবে থেকে সাইবারক্যাবে সাধারণ মানুষের সওয়ারি দেখতে পাব?”
টেসলা জানিয়েছে, স্টিয়ারিং হুইল বা প্যাডেলহীন বিশেষভাবে তৈরি রোবোট্যাক্সি ‘সাইবারক্যাব’-এর উৎপাদন ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। তবে যানবাহনগুলো এখনও রোবোট্যাক্সি নেটওয়ার্কে যুক্ত করা হয়নি। উপরন্তু মাস্ক নিজেই সতর্ক করেছেন যে, এর উৎপাদন বাড়ানোর গতি হবে “কষ্টদায়কভাবে ধীর”।
ঘুরে দাঁড়াচ্ছে মূল গাড়ি ব্যবসা
তবে এআই নিয়ে দুশ্চিন্তার মধ্যেও বৈশ্বিক বাজারে পেট্রোলের দাম বৃদ্ধির কারণে বিশেষ করে ইউরোপে বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) চাহিদা বেড়েছে। ফলে এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে রেকর্ড সংখ্যক গাড়ি সরবরাহ করেছে টেসলা, যা বাজার বিশ্লেষকদের অনুমানকেও ছাড়িয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের প্রত্যাশা, ২০২৬ সালে টেসলা ১৭ লাখ গাড়ি সরবরাহ করতে পারবে, যা আগের বছরের চেয়ে ৩.৯ শতাংশ বেশি। এর মাধ্যমে টানা দুই বছর ধরে বার্ষিক গাড়ি সরবরাহ কমার প্রবণতা থেকেও কোম্পানিটি বেরিয়ে আসতে পারবে।
আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বার্কলেসের বিশ্লেষকরা বলছেন, বিনিয়োগকারীদের মূল মনোযোগ টেসলার এআই রূপকল্পের ওপর থাকলেও, শক্তিশালী অটোমোবাইল ব্যবসা এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য প্রয়োজনীয় নগদ অর্থ জোগাতে সাহায্য করবে।
তবে দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) গাড়ি বিক্রি বাড়লেও তা বিশাল এই ব্যয় সামাল দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে। আর্থিক ডাটা সংস্থা এলএসইজি (LSEG)-এর তথ্যমতে, এই প্রান্তিকে টেসলা প্রায় ৩.৩ বিলিয়ন ডলারের ঋণাত্মক ক্যাশ ফ্লো রিপোর্ট করতে পারে।
অন্যদিকে ওয়াল স্ট্রিট বিশ্লেষকরা আশা করছেন, দ্বিতীয় প্রান্তিকে টেসলার প্রতি শেয়ারে আয় (ইপিএস) দাঁড়াবে ৫০ সেন্টে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪০ সেন্ট।
তবে ‘ডয়েচে ব্যাংক’-এর বিশ্লেষকদের মতে, চলতি বছরের শুরুতে এককালীন ‘ফুল সেলফ-ড্রাইভিং’ সফটওয়্যার কেনার নিয়ম তুলে দেওয়া এবং মে মাসে দেওয়া কম সুদের কিস্তি সুবিধার কারণে সার্বিক মুনাফায় কিছুটা টান পড়তে পারে।
‘ভিজিবল আলফা’-র তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় প্রান্তিকে রেগুলেটরি ক্রেডিট বাদ দিয়ে গাড়ি বিক্রিতে মোট মুনাফার হার (গ্রস মার্জিন) ১৮.১ শতাংশে নামতে পারে, যা এর আগের তিন মাসে ছিল ১৯.২ শতাংশ।