Meta Trader- ফিনটেক ও ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান এক্সটিবি (XTB) তাদের মোবাইল অ্যাপে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) চালিত একটি নতুন অ্যানালিটিক্যাল বা বিশ্লেষণাত্মক চ্যাট সুবিধা চালু করেছে। প্রথম দেশ হিসেবে চিলিতে সোমবার সেবাটি উন্মোচন করা হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স এবং লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপের (LSEG) সংগৃহীত বাজারভিত্তিক তথ্যের ভিত্তিতে এই এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট বা চ্যাটবটটি তৈরি করা হয়েছে, যা গ্রাহকদের যেকোনো প্রশ্নের উত্তর সার্বক্ষণিক (২৪/৭) সরবরাহ করবে।
এক্সটিবি জানিয়েছে, এই চ্যাট ফিচারের মূল উদ্দেশ্য হলো বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যক্তিগতকৃত (Personalized) বাজার পর্যবেক্ষণ তথ্য তুলে ধরা, পোর্টফোলিও বিশ্লেষণে সহায়তা করা এবং বিভিন্ন আর্থিক সম্পদের (Assets) মধ্যে সহজে তুলনা করার সুবিধা দেওয়া।
এটি প্রতিষ্ঠানটির এআই সম্প্রসারণের ধারাবাহিক রূপ। এর আগে গ্রাহকদের সাধারণ জিজ্ঞাসা মেটাতে এক্সটিবি একটি এআই চ্যাট বট তৈরি করেছিল, যা ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ প্রতি মাসে প্রায় ১ লাখ গ্রাহকের প্রশ্নের সমাধান নিশ্চিত করেছিল।
ইউরোপের বাইরে ধারাবাহিক সম্প্রসারণের শীর্ষে চিলি
নতুন এই এআই টুলটি সরাসরি এক্সটিবি ট্রেডিং অ্যাপের সাথে যুক্ত করা হয়েছে, যাতে প্রতিটি বিনিয়োগকারীর নিজস্ব প্রোফাইল, অভিজ্ঞতা এবং ঝুঁকির ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদর্শিত হয়। কোম্পানিটি জানিয়েছে, চিলিতে প্রাথমিক কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার পর ইউরোপের বাইরের অন্যান্য বাজারগুলোতে এই সেবা সম্প্রসারিত করা হবে।
তবে এক্সটিবি-র নিজ দেশ পোল্যান্ডে এই সেবা কবে নাগাদ চালু হবে, সে বিষয়ে এখনও কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সূচী ঘোষণা করা হয়নি।
এক্সটিবি-র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO) ওমর আর্নাউট বলেন, “এই টুলটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে প্রতিটি বিনিয়োগকারী তাদের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় তথ্যটি পেতে পারেন—যা ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতার স্তর, ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা এবং মূলধন ব্যবস্থাপনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।”
প্রধান হাইলাইটস ও ভৌগোলিক রূপরেখা
| সূচক / বিবরণ | বিশদ তথ্য |
| প্রথম বাজার (First Rollout) | চিলি (ইউরোপের বাইরে ধারাবাহিক সম্প্রসারণের অংশ) |
| উৎস উপাত্ত (Data Sources) | লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপ (LSEG) এবং রয়টার্স (Reuters) |
| কাজের ধরণ (Functionality) | গবেষণা, বাজার বিশ্লেষণ ও তুলনা (স্বয়ংক্রিয় ট্রেড সম্পন্ন করে না) |
| লাইসেন্সিং ব্যাকগ্রাউন্ড | চিলির ‘ফাইন্যান্সিয়াল মার্কেট কমিশন’ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এ অনুমোদিত |
ব্রোকারেজ অ্যাপে এআই যুক্ত করার বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা
খুচরা ব্রোকারেজ খাতে সরাসরি ট্রেডিং অ্যাপের ভেতর এআই টুল যুক্ত করার প্রতিযোগিতা জোরদার হচ্ছে:
- ওয়েবুল (Webull): মে মাসে ‘ভেগা অ্যানালিস্ট’ (Vega Analyst) নামে একটি মডিউলার রিসার্চ টুল চালু করে, যা কোম্পানির মৌলিক বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন এবং প্রযুক্তিগত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কাস্টম রিপোর্ট তৈরি করে।
- ডুকাসকপি ব্যাংক (Dukascopy Bank): জুন মাসে তাদের ডেমো অ্যাকাউন্টগুলোকে চ্যাটজিপিটি (ChatGPT) ও ক্লড (Claude)-এর মতো এক্সটার্নাল এআই অ্যাসিস্ট্যান্টের সাথে সংযুক্ত করে, যার মাধ্যমে চ্যাট নির্দেশনার দিয়েই সরাসরি ট্রেড পরিচালনা করা সম্ভব হয়।
- ইটোরো (eToro) ও টাইগার ব্রোকার্স: গত এক বছরে ইটোরো ‘এজেন্ট-ভিত্তিক’ ট্রেডিং টুল এনেছে এবং টাইগার ব্রোকার্স ২০১৩ সালে ‘টাইগারজিপিটি’ (TigerGPT) চালুর মাধ্যমে বাজার সৃষ্টি করে।
তবে এক্সটিবি স্পষ্ট করেছে যে, চিলিতে চালু হওয়া তাদের এই এআই অ্যাসিস্ট্যান্টটি মূলত একটি গবেষণা ও তথ্য প্রদানকারী টুল। এটি বিনিয়োগকারীদের প্রশ্নের উত্তর দেবে ও বাজারের সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করবে, কিন্তু গ্রাহকের পক্ষে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো ট্রেড বা লেনদেন সম্পন্ন করবে না।
এক্সটিবি-র পূর্বপ্রস্তুতি ও নিয়ন্ত্রকদের নজরদারি
এক্সটিবি ২০২৩ সালেই একটি বিশেষ ‘এআই বিভাগ’ গড়ে তোলে এবং রোবোটিক্স গবেষক তোমাস গাভরনকে এর প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেয়। এরপর থেকে গ্রাহক অনবোর্ডিং, অ্যাকাউন্ট মাইগ্রেশন এবং প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণে এআই প্রযুক্তির সফল ব্যবহার করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রযুক্তিটির ব্যাপক ব্যবহারের সাথে সাথে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় নিয়ন্ত্রক সংস্থাসমূহ কঠোর তদারকি শুরু করেছে। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাজ্যের ‘ফাইন্যান্সিয়াল কন্ডাক্ট অথরিটি’ (FCA) ৬ জুলাই তাদের ‘মিলস রিভিউ’ (Mills Review) প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলেছে, প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক পরামর্শের জায়গায় যেসব এআই সিস্টেম কাজ করছে, সেগুলো বর্তমান গ্রাহক সুরক্ষা আইনের আওতার বাইরে রয়েছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, সুনির্দিষ্ট আইনকানুন তৈরির আগেই কমপক্ষে ১০টি ব্রোকার প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের আসল অ্যাকাউন্টের সাথে এআই এজেন্টদের সরাসরি যুক্ত করে ফেলেছে।
আন্তর্জাতিক ব্রোকারেজ শিল্পে এআই বিশ্লেষক ব্যবহারকারীদের জন্য লাভজনক নাকি ঝুঁকিপূর্ণ—তা নিয়ে এখনও বিতর্ক চলছে। তবে ডেটা অ্যানালিটিক্স ফার্মের গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন ট্রেডারদের দ্রুত বাজার ত্যাগ করা রোধ করতে ও সিদ্ধান্ত নিতে ব্যক্তিগতকৃত তথ্য সরবরাহ বেশ ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।