MetaTrader: বিশ্ববাজারে নতুন করে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছিল। মধ্যপ্রাচ্যে সাময়িক যুদ্ধবিরতির ফলে বিনিয়োগকারীরা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশা করেছিলেন। তবে বুধবারের এক একক অধিবেশনেই সেই আশার গুড়ে বালি ঢেলে দিয়েছে বাজার। ইরাকে ইরান-সমর্থিত ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের যৌথ হামলা এবং জবাবে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের পর এক লাফেই ‘ব্রেন্ট ক্রুড’-এর দাম ৩.৪২% বেড়ে ব্যারেল প্রতি ৮৬.৯৭ ডলার এবং মার্কিন ‘ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট’ (ডব্লিউটিআই)-এর দাম ৩.৫৮% বেড়ে ৮২.০৯ ডলারে পৌঁছেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো যুদ্ধবিরতিকে স্থায়ী ধরে নেওয়া যে একটি অন্ধ অপটিমিজম বা অলীক আশা ছিল, বাজারচিত্র তা আরও একবার পরিষ্কার করে দিল।
মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে উভয় তেলের বেঞ্চমার্কে প্রায় ৩.৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ কোনো বিষয় নয়। ভৌগোলিক যে ঝুঁকির কথা বিনিয়োগকারীরা একপ্রকার ভুলেই গিয়েছিলেন, বাজার এখন তা নতুন করে হিসাব-নিকাশ করতে শুরু করেছে। কিছুদিন আগেই বাজারে কিছুটা স্থিতি দেখে যারা ঝুঁকি কমানোর কৌশল (হেজিং) থেকে সরে এসেছিলেন, তারা এখন বাধ্য হয়ে বেশি দামে সেই একই সুরক্ষামূলক অবস্থান পুনর্বহাল করছেন।
বিশ্বের সিংহভাগ জ্বালানি সরবরাহের প্রধান জলপথগুলোকে কেন্দ্র করে সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ায় তেলের ভৌত সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার আগেই বাজারে এর ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। তেলের দাম বাড়াতে তেলবাহী জাহাজে সরাসরি আঘাত করার প্রয়োজন নেই, কেবল বিশ্বাসের যোগ্য একটি হুমকিই যথেষ্ট। আর সেই হুমকি বিগত দুই মাসের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো সত্য হয়ে দেখা দিল।
এই উদ্বেগের প্রভাব কেবল জ্বালানি বাজারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; তেলের মূল্যের এমন আকস্মিক বৃদ্ধি কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সুদের হার সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
জ্বালানি খাতের এই অস্থিতিশীলতা সরাসরি মূল্যস্ফীতির সুচকে প্রভাব ফেলে, যা পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে তাদের কঠোর নীতিতে ফিরে যেতে বাধ্য করে। একই সংঘাতের আগের এক দফেও মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে সেপ্টেম্বর মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সুদের হার বাড়ানোর গুঞ্জন ত্বরান্বিত হয়েছিল। তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি কেবল নির্দিষ্ট এক খাতে নয়, বরং বাজারের প্রতিটি সম্পদ শ্রেণীর ওপর পুনর্মূল্যায়নের চাপ তৈরি করে।
এই ভৌগোলিক সংকটের সময় অনেক বিনিয়োগকারীই প্রথাগত কৌশল অনুসরণ করতে গিয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। অধিকাংশ খুচরা বিনিয়োগকারী ধরে নেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি তীব্র হলে সোনায় বিনিয়োগই নিরাপদ আশ্রয়।
তবে চলতি বছর চিত্রটি ভিন্ন। এই সংঘাতের বিভিন্ন পর্যায়ে স্বর্ণের দাম আসলে কমতে দেখা গেছে। তেলের মূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়। ফলে নির্দিষ্ট কোনো লভ্যাংশ না দেওয়া সোনা ধরে রাখা বিনিয়োগকারীদের কাছে কম আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। ফলস্বরূপ, বিপদের প্রথাগত ঢাল হিসেবে পরিচিত এই সম্পদটি প্রত্যাশিত সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
স্বতন্ত্র অর্থনৈতিক মডেলের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে তেলের দর দীর্ঘ সময় ধরে ব্যারেল প্রতি ৮০ ডলারের আশপাশে থাকলে তা বার্ষিক ভিত্তিতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হারকে অর্ধ শতাংশের বেশি কমিয়ে দিতে পারে এবং বিপরীতে মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে পূর্ণ এক শতাংশেরও বেশি।
বর্তমান বাজার দর ইতোমধ্যে সেই বিপজ্জনক সীমাকে অতিক্রম করে গেছে, অথচ সামরিক সংঘাত কেবল শুরু হলো।
অবশ্য এখনই আতঙ্কিত হওয়ার মতো কিছু ঘটেনি। এর অর্থ হলো, বিনিয়োগকারীদের কেবল একটি নির্দিষ্ট সম্পদের ওপর নির্ভর করে বসে থাকার ভুল থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এমন একটি বহুমুখী পোর্টফোলিও তৈরি করতে হবে, যা একটি নির্দিষ্ট খাতের ধাক্কাতেই ভেঙে পড়বে না।
সামরিক সংঘাতের চেয়েও বড় ঝুঁকি লুকিয়ে রয়েছে বাজারের এই অস্থিরতা দ্রুত ভুলে যাওয়ার প্রবণতায়। বিনিয়োগকারীদের জন্য যুদ্ধের চেয়ে বাজার সংশ্লিষ্টদের এই ‘উদাসীনতা’ বা অসচেতনতাই এখন বড় চিন্তার কারণ। কয়েক মাস ধরে এই অঞ্চলের সংঘাত সাময়িক বিরতি নিচ্ছে এবং আবার জ্বলে উঠছে। আর প্রতিটি বিরতি বাজারকে এই ভুল ধারণার দিকে ঠেলে দিচ্ছে যে ঝুঁকি হয়তো কেটে গেছে। কিন্তু ঝুঁকি মেটেনি; এটি কেবল পরবর্তী কোনো উস্কানির অপেক্ষায় ছিল, যা আজ বিশ্ববাজার প্রত্যক্ষ করল।
বিনিয়োগকারীদের উচিত তেলের এই দরবৃদ্ধিকে কোনো আকস্মিক চমক হিসেবে না দেখে একটি সুনির্দিষ্ট সতর্কবার্তা হিসেবে গ্রহণ করা।
সংঘাত শুরু হওয়া মাত্রই জ্বালানি খাতে এই অস্থিরতা ফিরে আসার কথা ছিল। মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির আশায় গড়ে তোলা বিনিয়োগ পোর্টফোলিওগুলোকে এখন বাস্তবতার মুখোমুখি এনে নতুন করে ঝালিয়ে নেওয়া জরুরি, কারণ এই অঞ্চলের শান্তি সবসময়ই ভঙ্গুর প্রমাণিত হয়েছে।