আজকের ফেডারেল ওপেন মার্কেট কমিটির (এফওএমসি) বৈঠকে নীতিগত সুদহার অপরিবর্তিত রাখার পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে, যেখানে পরিচালনা পর্ষদের দুজন সদস্য সুদের হার বাড়ানোর পক্ষে মতামত (ভিন্নমত) দিতে পারেন। এর ফলে বাজার সুদের হারে বড় ধরণের পতন হয়তো আটকানো সম্ভব হবে, তবে প্রাক-সতর্কতামূলক অবস্থান (Precautionary Positioning) শিথিল হওয়া এবং অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বিশ্ববাজারের নিম্নমুখী দামের প্রভাবে মার্কিন ডলারের দরপতন হতে পারে। সেই সূত্রে ইউরো/ইউএসডি (EUR/USD) জোড় তার সর্বনিম্ন অবস্থান অতিক্রম করে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মার্কিন ডলার (USD): তেলের দরপতনের প্রভাবে পড়তে পারে ডলারের দাম
আমাদের পূর্ববর্তী পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়েছিল—ফেডের সম্ভাব্য সুদের হার বৃদ্ধির আগাম আশঙ্কায় ডলার কিছুটা শক্তিশালী অবস্থানে ছিল। বাস্তব বাজার পরিস্থিতি সেই ধারণারই প্রতিফলন ঘটিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন ক্রেতাদের আস্থা সূচকের নিম্নমুখী রূপ এবং মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত প্রশমনের খবরে কিছুটা চাপ থাকলেও, অপরিশোধিত তেলের দাম কমার প্রভাবে মার্কিন ডলার ইনডেক্স (DXY)-এ বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।
তবে আজকের দিনটি ডলারের জন্য একটি বড় পরীক্ষার। ফিউচার্স মার্কেট বর্তমানে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ (বা ৭ বেসিস পয়েন্ট) সম্ভাবনা হিসাব করছে যে ফেড আজ সুদের হার বাড়াতে পারে। তাত্ত্বিকভাবে, ফেড যদি প্রত্যাশামাফিক সুদের হার অপরিবর্তিত রাখে, তবে স্বল্পমেয়াদি ডলার সুদের হারে সংশোধন বা পতন ঘটবে। এই পরিস্থিতিতে সবার নজর থাকবে পরিচালনা পর্ষদের অভ্যন্তরীণ ভোটের ব্যবধানের দিকে।
বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, গভর্নিং বডির দুই সদস্য—লরি লোগান ও বেথ হ্যামাক—সুদের হার বাড়ানোর পক্ষে ভোট দিতে পারেন। এটি ঘটলে বছর শেষের সুদের হারের পূর্বাভাস (৪১ বেসিস পয়েন্ট) কিছুটা সমর্থন পেলেও, ডলারের জন্য তা নিম্নমুখী ঝুঁকি তৈরি করবে। কারণ হিসেবে বলা যায়, সুদের হার অপরিবর্তিত থাকলে ডলারে বজায় রাখা সতর্কতামূলক অবস্থান শিথিল হবে, যার ফলে তেলের কমার প্রভাব ডলারের দামে প্রতিফলিত হতে শুরু করবে। গাল্ফ বা পারস্য উপসাগরে নতুন করে সামরিক হামলা শুরু হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেল ৯০ ডলারের নিচেই অবস্থান করছে, যা বাজারকে বড় ধরণের অস্থিরতা থেকে স্বস্তি দিচ্ছে।
সংক্ষেপে, ফেড চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ারশ যদি কোনো অপ্রত্যাশিত কঠোর (‘হকিশ’) বার্তা না দেন অথবা দুইয়ের অধিক সদস্য সুদের হার বাড়ানোর পক্ষে ভোট না দেন, তবে আজ মার্কিন ডলারের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি হতে পারে। পারস্য উপসাগরে স্থিতিশীলতার ইতিবাচক সংকেত অব্যাহত থাকলে চলতি সপ্তাহান্তেই ডলার ইনডেক্স (DXY) ১০১.০ পয়েন্টে নেমে যেতে পারে।
ইউরো (EUR): পুনরায় ১.১৫ ডলার স্পর্শ করার সম্ভাবনা কতটুকু?
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক হামলা ইউরো/ইউএসডি (EUR/USD) পেয়ারে সতর্ক থাকার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। তা সত্ত্বেও, ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত কমে আসার বিষয়ে বাজার যদি ইতিবাচক থাকে, তবে গত সপ্তাহেই এই পেয়ারটি তার সর্বনিম্ন স্তর পার করেছে বলে ধরা যায়। ইউরোর মান টেকসইভাবে ১.১৫ ডলার ছাড়িয়ে যেতে দুটি বিষয় প্রয়োজন: ১) অর্থনৈতিক তথ্য বা ফেডের বক্তব্যের মাধ্যমে নমনীয় বা ‘ডোভিশ’ সংকেত এবং ২) বাজারের সার্বিক ঝুঁকি গ্রহণের ইতিবাচক প্রবণতা (Risk Sentiment)। এ বছরের বসন্তে প্রযুক্তি খাতের উত্থান ইউরোকে সহায়তা করলেও, চিপ বা সেমিকন্ডাক্টর খাতের বর্তমান অস্থিরতা ইউরোর বাজার দর বৃদ্ধিতে কিছুটা বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
আজ ইউরোজোনের বড় কোনো অর্থনৈতিক প্রতিবেদন প্রকাশের সূচি না থাকায়, ইউরো মূলত ফেডের সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করবে। ফেডের পক্ষ থেকে সামান্য নমনীয় বার্তা এলেও আগামী দিনগুলোতে ইউরো/ইউএসডি ১.১৪০০ থেকে ১.১৪৫০ ডলার রেঞ্জে ফিরে আসতে পারে।
অস্ট্রেলীয় ডলার (AUD): আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে মূল্যস্ফীতির তথ্য
আজ সকালে প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, অস্ট্রেলিয়ায় মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশার চেয়েও কমেছে। জুনে ভোক্তা মূল্যসূচক (CPI) ৪.০% থেকে কমে ৩.৮%-এ নেমে এসেছে (ত্রৈমাসিক হিসাবে ০.৬%)। পাশাপাশি দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রিয় মূল্যস্ফীতি পরিমাপক ‘ট্রিমড মিন’ (Trimmed Mean) ৩.৬%-এ স্থির রয়েছে, যেখানে অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাস ছিল ৩.৭%।
এই প্রতিবেদনের পরপরই বাজারে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে: অস্ট্রেলিয়ার দুই বছরের সোয়াপ রেট ১০ বেসিস পয়েন্ট কমেছে, যার ফলে আজ জি-১০ (G10) মুদ্রাগুলোর মধ্যে একমাত্র অস্ট্রেলীয় ডলারই মার্কিন ডলারের বিপরীতে দুর্বল অবস্থানে ছিল।
রিজার্ভ ব্যাংক অব অস্ট্রেলিয়া (RBA) কর্তৃক ভবিষ্যতে নীতিগত সুদের হার বাড়ানোর যে সম্ভাবনা ধরা হয়েছিল, তা তথ্য প্রকাশের আগে ২০ বেসিস পয়েন্ট থেকে কমে এখন ১৩ বেসিস পয়েন্টে ঠেকেছে। যদিও আমরাও এ বছর আরবিএ (RBA) এর সুদহার বৃদ্ধির কোনো সম্ভাবনা দেখছি না, তবুও বাজারের এমন তীব্র প্রতিক্রিয়া কিছুটা অতিরিক্ত মনে হচ্ছে। জুলাই মাসে জ্বালানির বাড়তি দাম ইঙ্গিত দিচ্ছে যে চলতি গ্রীষ্মের বাকি সময়ে মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নাও হতে পারে। এছাড়া আরবিএ গর্ভনর মিশেল বুলকও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রায় ফেরাতে প্রয়োজনে আরও কড়াকড়ি করা হতে পারে।
স্বল্পমেয়াদে এশীয় শেয়ারবাজারের অস্থিরতায় অস্ট্রেলীয় ডলার চাপে থাকলেও, ফেডের সাময়িক শিথিলতা এবং অস্ট্রেলীয় পণ্যের বাণিজ্য সুবিধার কারণে মধ্যমেয়াদে এর সম্ভাবনা ইতিবাচক। আমরা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে AUD/USD এর লক্ষ্যমাত্রা ০.৭৩ ডলার নির্ধারণ বহাল রাখছি।
দায়মুক্তি (Disclaimer): আইএনজি (ING) প্রকাশিত এই প্রতিবেদনটি কেবল সাধারণ তথ্য প্রদানের উদ্দেশ্যে প্রণীত। এটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যবহারকারীর আর্থিক পরিস্থিতি বা বিনিয়োগের উদ্দেশ্য বিবেচনা করে তৈরি করা হয়নি। এই তথ্য কোনো ধরনের বিনিয়োগ পরামর্শ, আইনি বা কর সংক্রান্ত দিকনির্দেশনা কিংবা কোনো আর্থিক সম্পদ ক্রয়-বিক্রয়ের প্রস্তাব হিসেবে গণ্য হবে না।